The site is under serious construction! Please watch your step.
All Posts

বাঁকুড়া

May 1, 2017
Nita Das
#Bengali  #Bankura  #বাঁকুড়া  #ভ্রমণ 

Shushunia Hill
Jhau Forest
Nita

মানুষের মন ভারী অদ্ভূত। কিছুতেই কোনো এক স্থানে থাকতে পারে না। অজানা কিছুর তীব্র আকর্ষণে তাই চিরপরিচিত জগতটা ছেড়ে সে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে পড়ে নতুন কিছুর টানে। ঠিক এই রকমই একটা কিছু হল আমার সাথে। চারিদিকে অশান্ত পরিবেশ, নোংরামি, অপবাদ যখন এগিয়ে আসছে আমাকে গ্রাস করার জন্য তখন মনে হলো কথাও একটা চলে যাই। এই সব জঞ্জালের থেকে অনেক দুরে। পরিচিতদের ছাড়িয়ে অপরিচিতদের মধ্যে মিশে যাওয়া। নিজেকে নতুন ভাবে খুঁজে পাওয়া। তারিখ টা ছিল ২৩.১২.২০১৫। ডিসেম্বরের কনকনে ঠান্ডা রাত। হঠাত রাত ১০ টা নাগাদ ওর ফোন মামারবাড়ি থেকে। “বলছি, কাল আমরা বাঁকুড়া যাচ্ছি, সেই মত মানসিক প্রস্তুতি নাও, বাড়িতে বল আর ব্যাগ পত্র গুছিয়ে নাও, ভোরে বেরোতে হবে।” ওই ফোন তা ছিল গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে এক পশলা বৃষ্টির মত। খুব খুশি হলাম। মা, দাদা কে বললাম। বলে ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। সারারাত বারে বারে ঘুম ভাঙ্গছিল আর ঘড়ি দেখছিলাম। ভোর হলো। প্রস্তুত হয়ে সকাল ৬.৩০ নাগাদ বাড়ি থেকে বেরোলাম। বাস ধরে নামলাম তেলিয়ার মোড়। সেখান থেকেই দুর্গাপুর হাইওয়ে ধরব আমরা। প্রায় ৮ টা নাগাদ ও এলো মামাবাড়ি থেকে। বাইকে ট্যাঙ্ক ভর্তি করে ২৪ তারিখ কনকনে শীতের সকালে বেরিয়ে পড়লাম অজানা এক সফরে সাথে অল্প কিছু জামাকাপড় আর অতি প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস শুধু। গড়ে ৮০-৯০ কিমি/ঘন্টা বেগে গাড়ি ছুটতে লাগলো। কোনো হাইওয়েতে মোটামুটি এই ট্রাফিকের মধ্যে দিয়ে এই গতিতে বাইক চড়ার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। মাঝে মাঝে ও আমাকে জিগ্যেস করছিল আমার ভয় পাচ্ছে কিনা। সত্যি কথা বলতে কি ভয় আমার এক মুহুর্তের জন্যও লাগেনি। কারণটা সম্ভবত ওর প্রতি বিশ্বাস। আমি জানতাম ও আমাকে ঠিক নিয়ে যাবে ভীড় কাটিয়ে। বিন্দুমাত্র আঁচড়ও লাগবেনা আমার গায়ে। এক ঘন্টা পর পৌছলাম বর্ধমান। সেখানের একটি ছোট্ট চা এর দোকানে একটু হাত মুখ ধুয়ে চা বিস্কুট আর দোকানের প্রথম ভাজা গরম গরম আলুর চপ। অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা। তারপর আবার ছুটে চলল আমাদের বাইক। বর্ধমান শহরের গন্ডি পেরিয়ে দুর্গাপুর হাইওয়ের উপর দিয়ে চলা শুরু। ট্রাফিক অনেকটা হালকা হতে শুরু করেছে। প্রায় ৪৮কিমি চলার পর পানাগড় এসে রাস্তার বাম সাইড এ পড়ল ‘গ্রাম-বাংলা’ রেস্তোরা। ভারী মিষ্টি নাম। আবার নামলাম কিছুটা বিশ্রাম ও প্রাতঃরাশ সারার উদ্দ্যেশ্যে সেখানে জিভে জল আনা ছোলাপুরি দিয়ে সারলাম ব্রেকফাস্ট। তারপর আবার যাত্রা শুরু। নিজেকে হঠাত করে যেন যাযাবর মনে হচ্ছিল। যেন কোনো এক অজানার ডাকে ছুটে চলেছি। জিটি রোডে প্রবেশ করলাম। ৩-৪ কিমি যাবার পরই পড়ল মুচিপাড়া মোড়। বাম দিকে ৯নং স্টেট হাইওয়ে ধরে এগিয়ে চললাম। ঠিক মনে নেই তবে ৩-৪কিমি পর পার হলাম দুর্গাপুর স্টেশন। তারপরই এলো দামোদর নদী। কি অপরূপ তার শোভা। এক মুহুর্তের জন্য মনটা এখানেই দাঁড়িয়ে গেল যেন। কিন্তু আমাদের তো এগিয়ে চলতেই হবে। ঘড়ির কাঁটার সাথে ছুটে চলল আমাদের বাইক, তারপর এলো বারজোড়া। রাস্তার দুদিকে ঘন গাছপালায় ঠাসা। সবুজের কোলে এসে পড়লাম। লক্ষ্য করলাম এবার চারপাশে গাছপালার সমারোহ যেন বেড়েই চলেছে। বাঁকুড়া, শুশুনিয়ার একটা পূর্বাভাস দিচ্ছে তারা। ওই রাস্তায় হালকা মিঠে রোদে গা ভিজিয়ে এগিয়ে চললাম। পথে পড়ল বেলিয়াতোড়ার জঙ্গল। দুদিকে জঙ্গল, এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো জীবনটা এখানেই থেমে যাক। যেন আদি মানব হয়ে এই সবুজের কোলে কাটাই কিছুটা সময়। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা বলছে চলে যেতে হবে। এগিয়ে চললাম বাঁকুড়া শহরের উদ্দেশ্যে। রাস্তা দুদিকে ভাগ হয়ে গেল। একটি যাচ্ছে বিষ্ণুপুর আর অপরটি বাঁকুড়া স্টেশন রোড। দুপুর তখন প্রায় ১টা। বাইপাসের দিকে এগিয়ে চললাম থাকার কোনো আশ্রয় খোজার জন্য। ১.৩০ নাগাদ পৌছলাম হোটেল সপ্তর্ষি বা এ. কে. দত্ত হোটেলে। প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া সত্বেও আমাদের দুটো আলাদা ঘর নিতে হলো যেহেতু আমরা অববাহিত। জানিনা এ কোন গণতান্ত্রিক সমাজে বাস করছি আমরা। যেখানে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে মেয়ের একসাথে ব্যক্তিগত কিছু মুহূর্ত কাটানোর জন্য বিবাহিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। যাই হোক যে যার ঘরে গিয়ে স্নান করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। রুম নং ১০৬এ আমি আর ১০৯এ ও। ২টো নাগাদ লাঞ্চ এলো আমার ঘরে। ভাত, সবজি, ডাল আর মাছ। এই প্রথম অর সাথে এক সাথে বসে এ ভাবে খাওয়া দাওয়া করা। ও যখন আমার সামনে বসে তৃপ্তি করে খায় সেটা আমার দেখতে খুব ভালো লাগে। খেতে খেতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হতে লাগলো। একদিনে ঘটে চলা বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনা যেন দম বন্ধ করে দিচ্ছিল। মনে হলো অর সাথে সবকিছুর থেকে দুরে এই নিবিড় সময় কাটানোটা খুব দরকার ছিল। সবার থেকে এবং সব কিছুর থেকে দুরে সরে এসে আমরা কি চাই, আমাদের ভালবাসা, আমদের স্বপ্ন গুলো, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা সম্মান সব কিছু যেন আমাদের কাছে এনে দিল। খাওয়া দাওয়া সেরে কিছু ক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। হোটেলের ঘরগুলি ছিল চমত্কার। লাগোয়া বাথরুম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ড্রেসিং টেবিল, আলমারি এ যেন এক ছোট্ট জগৎ। বুকে মাথা রেখে যখন শুয়েছিলাম মনে হলো আমার দুনিয়ার সবথেকে সুখী মানুষ। যাই হোক, আবার প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পরলাম শুশুনিয়ার উদ্দেশ্যে। এক ভদ্রলোক কে জিগ্যেস করলাম। সত্যিই তিনি প্রকৃত অর্থে ভদ্রলোক। পথের দুধারে শুধুই অফুরন্ত সবুজ বনানী। উঁচু নিচু জমি আর নিষ্পাপ কিছু মানুষের কৌতুহলে তাকিয়ে থাকা। সব মিলিয়ে স্বর্গীয় এক আনন্দ আর মনের মধ্যে শুশুনিয়া কে দেখার অদম্য এক ইচ্ছা। দুরের কোনো উঁচু টিলা দেখলেই মনে হচ্ছে যেন ওই বুঝি শুশুনিয়া। প্রায় ১ ঘন্টা চলার অবশেষে দেখা মিলল সেই ধুম্রামান সুশুনিয়ার, কত স্মৃতি, কত উত্থান পতন এর সাক্ষী হয়ে যুগের পর যুগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে। দূর থেকে শুশুনিয়া কে খুব রহস্যময় লাগছিল। সূর্য অস্ত গেছে সন্ধ্যা নামব নামব আর দুরে শুশুনিয়া। দুজনেই মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ কিন্তু আমাদের ফিরতে তো হবেই। তাই হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বলে এলাম “বিদায় শুশুনিয়া, আবার এসব ফিরে”। ফেরার পথে একটি অসাধারণ জায়গা পড়ল গাছপালা আর মাঝখানে ছোট্ট একটা খাল। সেখানে না দাড়িয়ে পারলাম না। মিশে গেলাম সেই প্রকৃতির অপরূপ শোভায়। গলা ছেড়ে গান গাইলাম দুজনে। তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করলাম প্রতিটা মুহূর্ত। তারপর আবার শুরু হলো হোটেল ফেরার পালা। পরদিনই যেহেতু খ্রীষ্টমাস তাই বাঁকুড়া শহর সেজে উঠেছিল অপরুপ রূপে। শহরে একটি চার্চ এ গেলাম। কিছুটা সময় চার্চ এ কাটিয়ে সামনের একটি ফুচকার ষ্টলে ফুচকা আর তারপর হোটেল। ঠান্ডা বাড়তে লাগলো। রাত তখন ৮টা। আবার হেঁটে বেরিয়ে পড়লাম একটু আশপাশটা ঘুরে দেখার জন্য। স্থানীয় একটি দোকানে কফিতে চুমুক দিয়ে অপরিচিতদের ভিড়ে ভবঘুরের মত ঘুরতে লাগলাম। কেউ আমাদের চেনেনা, গায়ে কাদা ছড়ার মত কেউ নেই, শুধু ভালবাসার মানুষটা আর আমি। মনে হচ্ছে দিনটা যেন শেষ না হয়। একটি মন্দিরে আরতি হচ্ছিল। কিছুক্ষণ থামলাম সেখানে। জীবনে একসাথে এত বৈচিত্র্য আগে কখনো আসেনি। ৯টা নাগাদ ফিরলাম হোটেলে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পরলাম। ও টিভি চালিয়ে বসলো। আমি আর রাতে কিছু খেলাম না। শুধু একটা কোক। ও ডিনার সারলো।